Poems that are Songs

Poem 1 THOU hast made me endless, such is thy pleasure

আমারে তুমি অশেষ করেছ,     এমনি লীলা তব–
ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ,     জীবন নব নব॥
     কত-যে গিরি কত-যে নদী-তীরে
     বেড়ালে বহি ছোটো এ বাঁশিটিরে,
     কত-যে তান বাজালে ফিরে ফিরে
         কাহারে তাহা কব॥
তোমারি ওই অমৃতপরশে     আমার হিয়াখানি
হারালো সীমা বিপুল হরষে,     উথলি উঠে বাণী॥
     আমার শুধু একটি মুঠি ভরি
     দিতেছ দান দিবস-বিভাবরী–
     হল না সারা কত-না যুগ ধরি
         কেবলই আমি লব॥

Poem 3 I know not how thou singest, my master

তুমি        কেমন করে গান করো হে গুণী,
আমি       অবাক্‌ হয়ে শুনি কেবল শুনি॥
   সুরের আলো ভুবন ফেলে ছেয়ে,
   সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে,
   পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে
        বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী॥
     মনে করি অমনি সুরে গাই,
     কণ্ঠে আমার সুর খুঁজে না পাই।
   কইতে কী চাই, কইতে কথা বাধে-
   হার মেনে যে পরান আমার কাঁদে,
   আমায় তুমি ফেলেছ কোন্‌ ফাঁদে
          চৌদিকে মোর সুরের জাল বুনি॥

Poem 5 I ask for a moment’s indulgence to sit by thy side

তুমি      একটু কেবল বসতে দিয়ো কাছে
           আমায়   শুধু ক্ষণেক-তরে।
আজি    হাতে আমার যা-কিছু কাজ আছে
           আমি সাঙ্গ করব পরে॥
                না চাহিলে তোমার মুখপানে
                হৃদয় আমার বিরাম নাহি জানে,
                কাজের মাঝে ঘুরে বেড়াই যত
                     ফিরি কূলহারা সাগরে॥
      বসন্ত আজ উচ্ছ্বাসে নিশ্বাসে
             এল  আমার বাতায়নে।
      অলস ভ্রমর গুঞ্জরিয়া আসে,
             ফেরে  কুঞ্জের প্রাঙ্গণে।
                আজকে শুধু একান্তে আসীন
                চোখে চোখে চেয়ে থাকার দিন,
                আজকে জীবন-সমর্পণের গান
                    গাব  নীরব অবসরে॥

Poem 10 Here is thy footstool and there rest thy feet

যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন
             সেইখানে যে চরণ তোমার রাজে
       সবার পিছে, সবার নীচে, সবহারাদের মাঝে॥
যখন তোমায় প্রণাম করি আমি   প্রণাম আমার কোন্‌খানে যায় থামি।
       তোমার চরণ যেথায় নামে অপমানের তলে
            সেথায়   আমার প্রণাম নামে না যে
       সবার পিছে, সবার নীচে, সবহারাদের মাঝে॥
           অহঙ্কার তো পায় না নাগাল যেথায় তুমি ফের
                  রিক্তভূষণ দীন দরিদ্র সাজে
       সবার পিছে, সবার নীচে, সবহারাদের মাঝে।
ধনে মানে যেথায় আছে ভরি   সেথায় তোমার সঙ্গ আশা করি,
       সঙ্গী হয়ে আছ যেথায় সঙ্গীহীনের ঘরে
                   সেথায়   আমার হৃদয় নামে না যে
       সবার পিছে, সবার নীচে, সবহারাদের মাঝে॥

Poem 13 The song that I came to sing remains unsung

হেথা   যে গান গাইতে আসা, আমার    হয় নি সে গান গাওয়া-
আজও কেবলই সুর সাধা, আমার    কেবল গাইতে চাওয়া॥
আমার  লাগে নাই সে সুর, আমার    বাঁধে নাই সে কথা,
শুধু  প্রাণেরই মাঝখানে আছে   গানের ব্যাকুলতা।
আজও  ফোটে নাই সে ফুল, শুধু  বহেছে এক হাওয়া॥
আমি  দেখি নাই তার মুখ, আমি   শুনি নাই তার বাণী,
কেবল   শুনি ক্ষণে ক্ষণে তাহার   পায়ের ধ্বনিখানি-
আমার দ্বারের সমুখ দিয়ে সে জন   করে আসা-যাওয়া।
শুধু   আসন পাতা হল আমার   সারাটি দিন ধরে-
ঘরে   হয় নি প্রদীপ জ্বালা,  তারে   ডাকব কেমন করে।
আছি   পাবার আশা নিয়ে, তারে    হয় নি আমার পাওয়া॥

Poem 14 My desires are many and my cry is pitiful

আমি   বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে।
         এ কৃপা কঠোর সঞ্চিত মোর জীবন ভ’রে॥
না চাহিতে মোরে যা করেছ দান– আকাশ আলোক তনু মন প্রাণ,
        দিনে দিনে তুমি নিতেছ আমায় সে মহাদানেরই যোগ্য ক’রে
          অতি-ইচ্ছার সঙ্কট হতে বাঁচায়ে মোরে॥
আমি   কখনো বা ভুলি কখনো বা চলি তোমার পথের লক্ষ্য ধরে
         তুমি নিষ্ঠুর সম্মুখ হতে যাও যে সরে।
এ যে তব দয়া, জানি জানি হায়,   নিতে চাও ব’লে ফিরাও আমায়–
   পূর্ণ করিয়া লবে এ জীবন তব মিলনেরই যোগ্য ক’রে
         আধা-ইচ্ছার সঙ্কট হতে বাঁচায়ে মোরে॥

Poem 15 I am here to sing thee songs

আমি হেথায় থাকি শুধু গাইতে তোমার গান,
     দিয়ো তোমার জগৎ-সভায় এইটুকু মোর স্থান॥
আমি তোমার ভুবন-মাঝে    লাগি নি, নাথ, কোনো কাজে-
     শুধু কেবল সুরে বাজে   অকাজের এই প্রাণ॥
     নিশায় নীরব দেবালয়ে তোমার আরাধন,
     তখন মোরে আদেশ কোরো গাইতে হে রাজন।
ভোরে যখন আকাশ জুড়ে     বাজবে বীণা সোনার সুরে
     আমি যেন না রই দূরে, এই দিয়ো মোর মান॥

Poem 16 I have had invitation to this world’s festival

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ।
         ধন্য হল, ধন্য হল মানবজীবন॥
নয়ন আমার রূপের পুরে       সাধ মিটায়ে বেড়ায় ঘুরে,
         শ্রবণ আমার গভীর সুরে হয়েছে মগন॥
         তোমার যজ্ঞে দিয়েছ ভার, বাজাই আমি বাঁশি–
         গানে গানে গেঁথে বেড়াই প্রাণের কান্না হাসি।
    এখন সময় হয়েছে কি?      সভায় গিয়ে তোমায় দেখি’
         জয়ধ্বনি শুনিয়ে যাব এ মোর নিবেদন॥

Poem 18 Clouds heap upon clouds and it darkens

মেঘের পরে মেঘ জমেছে, আঁধার করে আসে।
আমায় কেন বসিয়ে রাখ একা দ্বারের পাশে॥
   কাজের দিনে নানা কাজে   থাকি নানা লোকের মাঝে,
   আজ আমি যে বসে আছি তোমারি আশ্বাসে॥
তুমি যদি না দেখা দাও, কর আমায় হেলা,
কেমন করে কাটে আমার এমন বাদল-বেলা।
   দূরের পানে মেলে আঁখি   কেবল আমি চেয়ে থাকি,
   পরান আমার কেঁদে বেড়ায় দুরন্ত বাতাসে॥

Poem 21 I must launch my boat

এবার       ভাসিয়ে দিতে হবে আমার এই তরী–
             তীরে ব’সে যায় যে বেলা, মরি গো মরি॥
        ফুল-ফোটানো সারা ক’রে   বসন্ত যে গেল সরে,
     নিয়ে ঝরা ফুলের ডালা বলো কী করি॥
জল উঠেছে ছল্‌ছলিয়ে, ঢেউ উঠেছে দুলে,
     মর্মরিয়ে ঝরে পাতা বিজন তরুমূলে।
        শূন্যমনে কোথায় তাকাস।
  ওরে, সকল বাতাস, সকল আকাশ
আজি    ওই পারের ওই বাঁশির সুরে উঠে শিহরি॥

Poem 22 In the deep shadows of the rainy July

আজি   শ্রাবণঘনগহন মোহে   গোপন তব চরণ ফেলে
       নিশার মতো, নীরব ওহে,   সবার দিঠি এড়ায়ে এলে॥
       প্রভাত আজি মুদেছে আঁখি,   বাতাস বৃথা যেতেছে ডাকি,
       নিলাজ নীল আকাশ ঢাকি   নিবিড় মেঘ কে দিল মেলে॥
       কূজনহীন কাননভূমি,   দুয়ার দেওয়া সকল ঘরে–
       একেলা কোন্‌ পথিক তুমি   পথিকহীন পথের ‘পরে।
       হে একা সখা, হে প্রিয়তম,   রয়েছে খোলা এ ঘর মম–
       সমুখ দিয়ে স্বপনসম   যেয়ো না মোরে হেলায় ঠেলে॥

Poem 23 Art thou abroad on this stormy night

আজি     ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার
         পরাণসখা বন্ধু হে আমার॥
   আকাশ কাঁদে হতাশসম,    নাই যে ঘুম নয়নে মম–
   দুয়ার খুলি হে প্রিয়তম, চাই যে বারে বার॥
         বাহিরে কিছু দেখিতে নাহি পাই,
         তোমার পথ কোথায় ভাবি তাই।
   সুদূর কোন্‌ নদীর পারে    গহন কোন্‌ বনের ধারে
   গভীর কোন্‌ অন্ধকারে হতেছ তুমি পার॥

Poem 26 He came and sat by my side but I woke up not

সে যে   পাশে এসে বসেছিল,   তবু জাগি নি।
কী ঘুম তোরে পেয়েছিল   হতভাগিনি॥
      এসেছিল নীরব রাতে,   বীণাখানি ছিল হাতে–
      স্বপন-মাঝে বাজিয়ে গেল   গভীর রাগিণী॥
জেগে দেখি দখিন-হাওয়া,   পাগল করিয়া
গন্ধ তাহার ভেসে বেড়ায়   আঁধার ভরিয়া।
      কেন আমার রজনী যায়,   কাছে পেয়ে কাছে না পায়–
      কেন গো তার মালার পরশ   বুকে লাগে নি॥

Poem 27 Light, oh where is light? Kindle it with burning fire of desire!

 কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো
       বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো॥
রয়েছে দীপ, না আছে শিখা,   এই কি ভালে ছিল রে লিখা–
       ইহার চেয়ে মরণ সে যে ভালো।
            বিরহানলে প্রদীপখানি জ্বালো॥
       বেদনদূতী গাহিছে, ⤗ওরে প্রাণ,
       তোমার লাগি জাগেন ভগবান।
নিশীথে ঘন অন্ধকারে   ডাকেন তোরে প্রেমাভিসারে,
       দুঃখ দিয়ে রাখেন তোর মান।
            তোমার লাগি জাগেন ভগবান।’
       গগনতল গিয়েছে মেঘে ভরি,
       বাদলজল পড়িছে ঝরি ঝরি।
এ ঘোর রাতে কিসের লাগি   পরান মম সহসা জাগি
       এমন কেন করিছে মরি মরি।
            বাদল-জল পড়িছে ঝরি ঝরি॥
       বিজুলি শুধু ক্ষণিক আভা হানে,
       নিবিড়তর তিমির চোখে আনে।
জানি না কোথা অনেক দূরে   বাজিল গান গভীর সুরে,
       সকল প্রাণ টানিছে পথপানে
            নিবিড়তর তিমির চোখে আনে।
       কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো
       বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো।
ডাকিছে মেঘ, হাঁকিছে হাওয়া,   সময় গেলে হবে না যাওয়া–
       নিবিড় নিশা নিকষঘনকালো।
            পরান দিয়ে প্রেমের দীপ জ্বালো॥

Poem 28 Obstinate are the trammels, but my heart aches

জড়ায়ে আছে বাধা, ছাড়ায়ে যেতে চাই–
    ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে।
মুক্তি চাহিবারে তোমার কাছে যাই,
    চাহিতে গেলে মরি লাজে॥
জানি হে তুমি মম জীবনে শ্রেয়তম,
এমন ধন আর নাহি যে তোমা-সম,
তবু যা ভাঙাচোরা ঘরেতে আছে পোরা
    ফেলিয়া দিতে পারিনা যে॥
তোমারে আবরিয়া ধুলাতে ঢাকে হিয়া,
    মরণ আনে রাশি রাশি–
আমি যে প্রাণ ভরি তাদের ঘৃণা করি
    তবুও তাই ভালোবাসি।
এতই আছে বাকি, জমেছে এত ফাঁকি,
কত যে বিফলতা, কত যে ঢাকাঢাকি,
আমার ভালো তাই চাহিতে যবে যাই
    ভয় যে আসে মনোমাঝে॥

Poem 39 When the heart is hard and perched up, come upon me

 জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো।
     সকল মাধুরী লুকায়ে যায়,    গীতসুধারসে এসো॥
কর্ম যখন প্রবল-আকার     গরজি উঠিয়া ঢাকে চারি ধার
     হৃদয়প্রান্তে, হে জীবননাথ,    শান্ত চরণে এসো॥
আপনারে যবে করিয়া কৃপণ    কোণে পড়ে থাকে দীনহীন মন
     দুয়ার খুলিয়া, হে উদার নাথ, রাজসমারোহে এসো।
বাসনা যখন বিপুল ধুলায়    অন্ধ করিয়া অবোধে ভুলায়,
     ওহে পবিত্র, ওহে অনিদ্র, রুদ্র আলোকে এসো॥

Poem 44 This is my delight, thus to wait and watch

আমার এই   পথ-চাওয়াতেই আনন্দ।
খেলে যায়   রৌদ্র ছায়া,   বর্ষা আসে   বসন্ত॥
কারা এই   সমুখ দিয়ে   আসে যায়   খবর নিয়ে,
খুশি রই আপন মনে–  বাতাস বহে   সুমন্দ॥
সারাদিন   আঁখি মেলে   দুয়ারে   রব একা,
শুভখন   হঠাৎ এলে   তখনি   পাব দেখা।
ততখন   ক্ষণে ক্ষণে   হাসি গাই   আপন-মনে,
ততখন   রহি রহি   ভেসে আসে   সুগন্ধ॥

Poem 45 Have you heard his silent steps?

তোরা   শুনিস নি কি শুনিস নি তার পায়ের ধ্বনি,
          ওই যে   আসে, আসে, আসে।
       যুগে যুগে পলে পলে দিন-রজনী
          সে যে   আসে, আসে, আসে॥
গেয়েছি গান যখন যত   আপন মনে খ্যাপার মতো
       সকল সুরে বেজেছে তার আগমনী–
          সে যে   আসে, আসে, আসে॥
       কত কালের ফাগুন-দিনে বনের পথে
          সে যে   আসে, আসে, আসে।
       কত শ্রাবণ-অন্ধকারে মেঘের রথে
          সে যে   আসে, আসে, আসে।
দুখের পরে পরম দুখে    তারি চরণ বাজে বুকে,
       সুখে কখন বুলিয়ে সে দেয় পরশমণি।
          সে যে   আসে, আসে, আসে॥

Poem 46 I know now from what distant time thou

আমার মিলন লাগি তুমি    আসছ কবে থেকে
তোমার চন্দ্র সূর্য তোমায়    রাখবে কোথায় ঢেকে?।
কতকালের সকাল-সাঁঝে    তোমার চরণধ্বনি বাজে,
গোপনে দূত হৃদয়-মাঝে    গেছে আমায় ডেকে॥
ওগো পথিক, আজকে আমার    সকল পরান ব্যেপে
থেকে থেকে হরষ যেন     উঠছে কেঁপে কেঁপে।
যেন সময় এসেছে আজ    ফুরালো মোর যা ছিল কাজ–
বাতাস আসে, হে মহারাজ,   তোমার গন্ধ মেখে॥

Poem 49 You came down from your throne

তব   সিংহাসনের আসন হতে এলে তুমি নেমে–
মোর   বিজন ঘরের দ্বারের কাছে দাঁড়ালে, নাথ, থেমে॥
       একলা বসে আপন-মনে গাইতেছিলেম গান
       তোমার কানে গেল সে সুর, এলে তুমি নেমে
মোর   বিজন ঘরের দ্বারের কাছে দাঁড়ালে, নাথ, থেমে॥
       তোমার সভায় কত যে গান, কতই আছে গুণী–
       গুণহীনের গানখানি আজ বাজল তোমার প্রেমে
       লাগল সকল তানের মাঝে একটি করুণ সুর,
       হাতে লয়ে বরণমালা এলে তুমি নেমে–
মোর   বিজন ঘরের দ্বারের কাছে দাঁড়ালে, নাথ, থেমে॥

Poem 53 Beautiful is thy wristlet, decked with stars

সুন্দর বটে তব অঙ্গদখানি   তারায় তারায় খচিত–
      স্বর্ণে রত্নে শোভন লোভন জানি,   বর্ণে বর্ণে রচিত॥
খড়গ তোমার আরো মনোহর লাগে   বাঁকা বিদ্যুতে আঁকা সে
গরুড়ের পাখা রক্ত রবির রাগে   যেন গো অস্ত-আকাশে॥
  জীবনশেষের শেষ্জাগরণসম    ঝল্সিছে মহাবেদনা–
  নিমেষে দহিয়া যাহা-কিছু আছে মম    তীব্র ভীষণ চেতনা।
    সুন্দর বটে তব অঙ্গদখানি   তারায় তারায় খচিত–
খড়গ তোমার, হে দেব, বজ্রপাণি,   চরম শোভায় রচিত॥

Poem 55 Langour is upon your heart and the slumber

এখনো ঘোর ভাঙে না তোর যে,   মেলে না তোর আঁখি–
কাঁটার বনে ফুল ফুটেছে রে   জানিস নে তুই তা কি?
ওরে অলস,   জানিস নে তুই তা কি?
জাগো এবার জাগো,   বেলা কাটাস না গো॥
কঠিন পথের শেষে   কোথায়   অগম বিজন দেশে
ও সেই বন্ধু আমার একলা আছে গো,   দিস্‌ নে তারে ফাঁকি॥
প্রখর রবির তাপে   নাহয়   শুষ্ক গগন কাঁপে,
নাহয়   দগ্ধ বালু তপ্ত আঁচলে   দিক চারি দিক ঢাকি–
পিপাসাতে   দিক চারি দিক ঢাকি।
মনের মাঝে চাহি   দেখ্‌ রে   আনন্দ কি নাহি।
পথে   পায়ে পায়ে দুখের বাঁশরি   বাজবে তোরে ডাকি–
মধুর সুরে   বাজবে তোরে ডাকি॥

Poem 56 Thus it is that thy joy in me is full

তাই তোমার আনন্দ আমার ‘পর
       তুমি   তাই এসেছ নীচে–
আমায় নইলে, ত্রিভুবনেশ্বর,
  তোমার   প্রেম হত যে মিছে॥
     আমায় নিয়ে মেলেছ এই মেলা,
     আমার হিয়ায় চলছে রসের খেলা,
     মোর জীবনে বিচিত্র রূপ ধরে
       তোমার   ইচ্ছা তরঙ্গিছে॥
তাই তো তুমি রাজার রাজা হয়ে
     তবু   আমার হৃদয় লাগি
ফিরছ কত মনোহরণ বেশে,
     প্রভু,   নিত্য আছ জাগি।
            তাই তো, প্রভু যেথায় এল নেমে
            তোমারি প্রেম ভক্তপ্রাণের প্রেমে
মূর্তি তোমার যুগলসম্মিলনে   সেথায়   পূর্ণ প্রকাশিছে॥

Poem 57 Light, my light, the world filling light

আলো আমার, আলো ওগো, আলো ভুবন-ভরা,
আলো নয়ন-ধোওয়া  আমার, আলো হৃদয়-হরা॥
      নাচে আলো নাচে, ও ভাই,    আমার প্রাণের কাছে–
      বাজে আলো বাজে, ও ভাই,    হৃদয়বীণার মাঝে–
      জাগে আকাশ, ছোটে বাতাস, হাসে সকল ধরা॥
আলোর স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি।
আলোর ঢেউয়ে উঠল নেচে মল্লিকা মালতী।
      মেঘে মেঘে সোনা, ও ভাই,    যায় না মানিক গোনা–
      পাতায় পাতায় হাসি, ও ভাই,      পুলক রাশি রাশি–
      সুরনদীর কূল ডুবেছে সুধা-নিঝর-ঝরা॥

Poem 59 Yes, I know, this is nothing, but thy love

এই-যে তোমার প্রেম, ওগো হৃদয়হরণ,
       এই-যে পাতায় আলো নাচে সোনার বরন॥
এই-যে মধুর আলসভরে   মেঘ ভেসে যায় আকাশ ‘পরে,
       এই-যে বাতাস দেহে করে অমৃতক্ষরণ॥
প্রভাত-আলোর ধারায় আমার নয়ন ভেসেছে।
  এই তোমারি প্রেমের বাণী প্রাণে এসেছে।
       তোমারি মুখ ওই নুয়েছে,   মুখে আমার চোখ থুয়েছে,
         আমার হৃদয় আজ ছুঁয়েছে তোমারি চরণ॥

Poem 63 Thou hast made me known to friends whom I knew not

 কত অজানারে জানাইলে তুমি, কত ঘরে দিলে ঠাঁই–
     দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু, পরকে করিলে ভাই॥
পুরানো আবাস ছেড়ে যাই যবে   মনে ভেবে মরি কী জানি কী হবে–
     নূতনের মাঝে তুমি পুরাতন   সে কথা যে ভুলে যাই॥
     জীবনে মরণে নিখিল ভুবনে যখনি যেখানে লবে
     চিরজনমের পরিচিত ওহে তুমিই চিনাবে সবে।
তোমারে জানিলে নাহি কেহ পর, নাহি কোনো মানা, নাহি কোনো ডর–
     সবারে মিলায়ে তুমি জাগিতেছ দেখা যেন সদা পাই॥

Poem 65 What divine drink wouldst thou have, my God

হে মোর দেবতা, ভরিয়া এ দেহ প্রাণ
কী অমৃত তুমি চাহ করিবারে পান?।
    আমার নয়নে তোমার বিশ্বছবি
    দেখিয়া লইতে সাধ যায় তব কবি,
    আমার মুগ্ধ শ্রবণে নীরব রহি
       শুনিয়া লইতে চাহ আপনার গান॥
আমার চিত্তে তোমার সৃষ্টিখানি
রচিয়া তুলিছে বিচিত্র তব বাণী।
    তারি সাথে, প্রভু, মিলিয়া তোমার প্রীতি
    জাগায়ে তুলিছে আমার সকল গীতি–
    আপনারে তুমি দেখিছ মধুর রসে–
       আমার মাঝারে নিজেরে করিয়া দান॥

Poem 70 Is it beyond thee to be glad with

পারবি না কি যোগ দিতে এই ছন্দে রে
   এই   খসে যাবার, ভেসে যাবার, ভাঙ্বারই আনন্দে রে॥
পাতিয়া কান শুনিস না যে   দিকে দিকে গগনমাঝে
   মরণবীণায় কী সুর বাজে তপন-তারা-চন্দ্রে রে–
   জ্বালিয়ে আগুন ধেয়ে ধেয়ে জ্বলবারই আনন্দে রে॥
পাগল-করা গানের তানে   ধায় যে কোথা কেই বা জানে,
   চায় না ফিরে পিছন-পানে, রয় না বাঁধা বন্ধে রে–
   লুটে যাবার, ছুটে যাবার, চলবারই আনন্দে রে।
সেই আনন্দ-চরণ-পাতে ছয় ঋতু যে নৃত্যে মাতে,
   প্লাবন বহে যায় ধরাতে বরন গীতে গন্ধে রে–
   ফেলে দেবার, ছেড়ে দেবার, মরবারই আনন্দে রে॥

Poem 72 He it is, the innermost one

কে গো অন্তরতর সে
  আমার চেতনা আমার বেদনা তারি সুগভীর পরশে॥
আঁখিতে আমার বুলায় মন্ত্র,   বাজায় হৃদয়বীণার তন্ত্র,
    কত আনন্দে জাগায় ছন্দ কত সুখে দুখে হরষে॥
সোনালি রুপালি সবুজে সুনীলে   সে এমন মায়া কেমনে গাঁথিলে–
    তারি সে আড়ালে চরণ বাড়ালে, ডুবালে সে সুধাসরসে।
কত দিন আসে, কত যুগ যায়,   গোপনে গোপনে পরান ভুলায়,
নানা পরিচয়ে নানা নাম ল’য়ে নিতি নিতি রস বরষে॥

Poem 74 The day is no more, the shadow is upon the earth

আর   নাই রে বেলা, নামল ছায়া ধরণীতে।
এখন   চল্‌ রে ঘাটে কলসখানি ভরে নিতে॥
      জলধারার কলস্বরে   সন্ধ্যাগগন আকুল করে,
ওরে,  ডাকে আমায় পথের ‘পরে সেই ধ্বনিতে॥
এখন   বিজন পথে করে না কেউ আসা যাওয়া।
ওরে,  প্রেমনদীতে উঠেছে ঢেউ, উতল হাওয়া।
      জানি নে আর ফিরব কিনা, কার সাথে আজ হবে চিনা–
ঘাটে  সেই অজানা বাজায় বীণা তরণীতে॥

Poem 76 Day after day, O Lord of my life

প্রতিদিন আমি, হে জীবনস্বামী, দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে।
করি জোড়কর, হে ভুবনেশ্বর, দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে॥
   তোমার অপার আকাশের তলে বিজনে বিরলে হে–
   নম্র হৃদয়ে নয়নের জলে দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে॥
তোমার বিচিত্র এ ভবসংসারে কর্মপারাবারপারে হে–
নিখিল ভুবনলোকের মাঝারে দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে।
   তোমার এ ভবে মম কর্ম যবে সমাপন হবে হে,
   ওগো রাজরাজ, একাকী নীরবে দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে॥

Poem 77 I know thee as my God and stand apart

দেবতা জেনে দূরে রই দাঁড়ায়ে,
               আপন জেনে আদর করি নে।
        পিতা ব’লে প্রণাম করি পায়ে,
                বন্ধু ব’লে দু হাত ধরি নে॥
         আপনি তুমি অতি সহজ প্রেমে
         আমার হয়ে যেথায় এলে নেমে
সেথায় সুখে বুকের মধ্যে ধ’রে সঙ্গী ব’লে তোমায় বরি নে॥
         ভাই তুমি যে ভাইয়ের মাঝে, প্রভু,
         তাদের পানে তাকাই না যে তবু–
ভাইয়ের সাথে ভাগ ক’রে মোর ধন তোমার মুঠা কেন ভরি নে।
         ছুটে এসে সবার সুখে দুখে
         দাঁড়াই নে তো তোমারি সম্মুখে,
সঁপিয়ে প্রাণ ক্লান্তিবিহীন কাজে প্রাণসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ি নে॥

Poem 79 If it is not my portion to meet thee in this my life

যদি    তোমার দেখা না পাই, প্রভু, এবার এ জীবনে
তবে    তোমায় আমি পাই নি যেন সে কথা রয় মনে।
যেন     ভুলে না যাই, বেদনা পাই   শয়নে স্বপনে॥
                     এ সংসারের হাটে
            আমার   যতই দিবস কাটে,
            আমার   যতই দু হাত ভরে উঠে ধনে
তবু    কিছুই আমি পাই নি যেন    সে কথা রয় মনে।
যেন    ভুলে না যাই, বেদনা পাই   শয়নে স্বপনে॥
                     যদি আলসভরে
            আমি   বসি পথের ‘পরে,
            যদি   ধুলায় শয়ন পাতি সযতনে,
যেন    সকল পথই বাকি আছে সে কথা রয় মনে।
যেন    ভুলে না যাই, বেদনা পাই,   শয়নে স্বপনে।
                     যতই উঠে হাসি,
            ঘরে   যতই বাজে বাঁশি,
            ওগো   যতই গৃহ সাজাই আয়োজনে,
যেন    তোমায় ঘরে হয় নি আনা    সে কথা রয় মনে।
যেন    ভুলে না যাই, বেদনা পাই   শয়নে স্বপনে॥

Poem 83 Mother, I shall weave a chain of pearls

তোমার   সোনার থালায় সাজাব আজ দুখের অশ্রুধার।
    জননী গো, গাঁথব তোমার গলার মুক্তাহার॥
       চন্দ্র সূর্য পায়ের কাছে  মালা হয়ে জড়িয়ে আছে,
তোমার   বুকে শোভা পাবে আমার দুখের অলঙ্কার॥
       ধন ধান্য তোমারই ধন কী করবে তা কও।
       দিতে চাও তো দিয়ো আমায়, নিতে চাও তো লও।
    দুঃখ আমার ঘরের জিনিস,   খাঁটি রতন তুই তো চিনিস–
তোর     প্রসাদ দিয়ে তারে কিনিস এ মোর অহঙ্কার॥

Poem 84 It is the pang of separation that spreads

হেরি অহরহ তোমারি বিরহ ভুবনে ভুবনে রাজে হে,
   কত রূপ ধরে কাননে ভূধরে আকাশে সাগরে সাজে হে॥
       সারা নিশি ধরি তারায় তারায় অনিমেষ চোখে নীরবে দাঁড়ায়.
            পল্লবদলে শ্রাবণধারায় তোমারি বিরহ বাজে হে॥
ঘরে ঘরে আজি কত বেদনায়   তোমারি গভীর বিরহ ঘনায়
   কত প্রেমে হায়, কত বাসনায়, কত সুখে দুখে কাজে হে।
       সকল জীবন উদাস করিয়া   কত গানে সুরে গলিয়া ঝরিয়া
             তোমার বিরহ উঠিছে ভরিয়া আমার হিয়ার মাঝে হে॥

Poem 89 No more noisy, loud words from me

কোলাহল তো বারণ হল, এবার কথা কানে কানে।
  এখন হবে প্রাণের আলাপ কেবলমাত্র গানে গানে॥
রাজার পথে লোক ছুটেছে,   বেচা-কেনার হাঁক উঠেছে,
  আমার ছুটি অবেলাতেই দিন-দুপুরের মধ্য্খানে–
  কাজের মাঝে ডাক পড়েছে কেন যে তা কেই-বা জানে॥
  মোর কাননে অকালে ফুল উঠুক তবে মুঞ্জরিয়া।
  মধ্যদিনে মৌমাছিরা বেড়াক মৃদু গুঞ্জরিয়া।
মন্দভালোর দ্বন্দ্বে খেটে     গেছে তো দিন অনেক কেটে,
  অলস বেলার খেলার সাথি এবার আমার হৃদয় টানে–
      বিনা কাজের ডাক পড়েছে
                 কেন যে তা কেই-বা জানে॥

Poem 93 I have got my leave

পেয়েছি ছুটি, বিদায় দেহো ভাই–
       সবারে আমি প্রণাম করে যাই॥
ফিরায়ে দিনু দ্বারের চাবি      রাখি না আর ঘরের দাবি–
       সবার আজি প্রসাদবাণী চাই॥
       অনেক দিন ছিলাম প্রতিবেশী,
       দিয়েছি যত নিয়েছি তার বেশি।
প্রভাত হয়ে এসেছে রাতি   নিবিয়া গেল কোণের বাতি–
       পড়েছে ডাক, চলেছি আমি তাই॥

Poem 94 At this time of my parting

আমার      যাবার বেলাতে
     সবাই    জয়ধ্বনি কর্‌।
        ভোরের আকাশ রাঙা হল রে,
    আমার     পথ হল সুন্দর॥
কী নিয়ে বা যাব সেথা   ওগো তোরা ভাবিস নে তা,
       শূন্য হাতেই চলব বহিয়ে
  আমার       ব্যাকুল অন্তর॥
       মালা প’রে যাব মিলনবেশে,
  আমার       পথিকসজ্জা নয়।
       বাধা বিপদ আছে মাঝের দেশে,
  মনে       রাখি নে সেই ভয়।
যাত্রা যখন হবে সারা   উঠবে জ্বলে সন্ধ্যাতারা,
            পূরবীতে করুণ বাঁশরি
       দ্বারে   বাজবে মধুর স্বর॥

Poem 97 When my play was with thee

আমার    খেলা যখন ছিল তোমার সনে
          তখন   কে তুমি তা কে জানত।
তখন     ছিল না ভয়, ছিল না লাজ মনে,
          জীবন   বহে যেত অশান্ত॥
তুমি     ভোরের বেলা ডাক দিয়েছ কত
          যেন আমার আপন সখার মতো,
হেসে     তোমার সাথে ফিরেছিলেম ছুটে
          সে দিন   কত-না বন-বনান্ত॥
ওগো,    সেদিন তুমি গাইতে যে-সব গান
          কোনো   অর্থ তাহার কে জানত।
শুধু      সঙ্গে তারি গাইত আমার প্রাণ,
         সদা   নাচত হৃদয় অশান্ত।
হঠাৎ    খেলার শেষে আজ কি দেখি ছবি–
          স্তব্ধ আকাশ, নীরব শশী রবি,
তোমার   চরণ-পানে নয়ন করি নত
         ভুবন  দাঁড়িয়ে আছে একান্ত॥

Poem 98 I will deck thee with trophies, garlands of my defeat

হার-মানা হার পরাব তোমার গলে–
দূরে রব কত আপন বলের ছলে॥
     জানি আমি জানি ভেসে যাবে অভিমান–
     নিবিড় ব্যথায় ফাটিয়া পড়িবে প্রাণ,
     শূন্য হিয়ার বাঁশিতে বাজিবে গান,
         পাষাণ তখন গলিবে নয়নজলে॥
শতদলদল খুলে যাবে থরে থরে,
লুকানো রবে না মধু চিরদিন-তরে।
     আকাশ জুড়িয়া চাহিবে কাহার আঁখি,
     ঘরের বাহিরে নীরবে লইবে ডাকি,
     কিছুই সেদিন কিছুই রবে না বাকি–
         পরম মরণ লভিব চরণতলে॥

Poem 100 I dive down in to the depth of the ocean of forms

রূপসাগরে ডুব দিয়েছি অরূপরতন আশা করি,
ঘাটে ঘাটে ঘুরব না আর ভাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী॥
  সময় যেন হয় রে এবার   ঢেউ-খাওয়া সব চুকিয়ে দেবার,
     সুধায় এবার তলিয়ে গিয়ে অমর হয়ে রব মরি॥
যে গান কানে যায় না শোনা সে গান যেথায় নিত্য বাজে
প্রাণের বীণা নিয়ে যাব সেই অতলের সভা-মাঝে॥
  চিরদিনের সুরটি বেঁধে   শেষ গানে তার কান্না কেঁদে
     নীরব যিনি তাঁহার পায়ে নীরব বীণা দিব ধরি॥

Poem 103 In one salutation to thee, my God

একটি নমস্কারে, প্রভু, একটি নমস্কারে
    সকল দেহ লুটিয়ে পড়ুক তোমার এ সংসারে॥
ঘন শ্রাবণমেঘের মতো    রসের ভারে নম্র নত
    একটি নমস্কারে, প্রভু , একটি নমস্কারে
    সমস্ত মন পড়িয়া থাক্‌ তব ভবনদ্বারে॥
নানা সুরের আকুল ধারা     মিলিয়ে দিয়ে আত্মহারা
    একটি নমস্কারে, প্রভু , একটি নমস্কারে
    সমস্ত গান সমাপ্ত হোক নীরব পারাবারে॥
হংস যেমন মানসযাত্রী   তেমনি সারা দিবসরাত্রি
    একটি নমস্কারে, প্রভু , একটি নমস্কারে
    সমস্ত প্রাণ উড়ে চলুক মহামরণ-পরে॥